হঠাৎ উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা বিএনপির

আন্দোলনের ঘোষিত কোনো কর্মসূচি না থাকলেও রাজনীতিতে হঠাৎ উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করছে বিএনপি। আগামী ৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগে দলটির কারাবন্দি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের শুনানিকে সামনে রেখেই বিএনপি কার্যত এই উত্তাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এ সরকারের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন হুঁশিয়ারির ভাষায় বলেছেন, ৫ ডিসেম্বর খালেদা জিয়াকে জামিন দেওয়া না হলে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন হবে। তবে একই দিন পৃথক অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির আরেক জ্যেষ্ঠ সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘মানুষ এ সরকারের পতন চাইছে, এজন্য তারা আমাদেরকে কর্মসূচির জন্য চাপ দিচ্ছে; তবে আমি মনে করি আন্দোলনের উপযুক্ত সময় এখনো আসেনি।’ মওদুদ আহমদের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্দোলন প্রশ্নে বিএনপির মধ্যে সমন্বয়হীনতা কিংবা মতপার্থক্যের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই গত মঙ্গলবার হাইকোর্টের সামনে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ ও গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় গ্রেফতার-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মাঝে। ঐ বিক্ষোভ-ভাঙচুরের ঘটনায় ২৮ জনের নাম উল্লেখ করে পাঁচ শতাধিক নেতাকে জড়িয়ে শাহবাগ থানায় মামলা দিয়ে তাদের গ্রেফতারে তত্পর পুলিশ। মামলায় বিএনপির মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যসহ জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদেরও আসামি করা হয়েছে।

এই মামলায় বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেনসহ তিন জনকে গতকাল আটক করেছে পুলিশ। আগের দিন বৃহস্পতিবার গ্রেফতার হওয়ার পর অবশ্য বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বিকেলে নিম্ন আদালত থেকে জামিন পান। গ্রেফতার এড়াতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল বৃহস্পতিবার এই মামলায় উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নেন। এর আগে মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক হন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ, তিনি মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। একই মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী ছাত্রদল নেতা মোস্তাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে হাইকোর্টের সামনে বিএনপির নেতাকর্মীদের অবস্থান কর্মসূচির একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধাওয়া, পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এ সময় কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিএনপির নেতাকর্মীদের হঠাত্ করে রাস্তায় বিক্ষোভ করা এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিস্মিত করেছে। বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। কারণ এর আগেই মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির নেতারা এখন থেকে অনুমতি না নিয়ে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

সরকারের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে :মির্জা ফখরুল

গত ১০ নভেম্বর মারা যাওয়া কৃষিবিদ জাবেদ ইকবালের স্মরণে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক স্মরণসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এ সরকারের বিদায় সমাগত। তাদের বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে। সেদিন আমাদের খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাহেব বলেছেন—ইডেনে উনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ঘণ্টা বাজিয়ে উদ্বোধন করেছেন ক্রিকেট খেলা, তাদেরও (সরকারের) ঘণ্টা বাজছে আর কি। ঘণ্টার ধ্বনি শোনা যাচ্ছে চারদিকে। নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থতাই সরকারের পতন ডেকে আনছে।’

বিএনপি নিজেরাই ভেঙে যাবে—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিএনপির জন্মের পর থেকে ভাঙতে বহুবার চেষ্টা করেছে অনেকেই। এরশাদ সাহেবও চেষ্টা করেছেন বিএনপিকে ভাঙতে, সফল হননি। এরা (আওয়ামী লীগ সরকার) তো ১০ বছর ধরে চেষ্টা করছে বিএনপিকে ভেঙে ফেলার। এখন পর্যন্ত একটা লোককেও সরাতে পারেনি।

খালেদা জিয়ার জামিন না হলে এক দফার আন্দোলন: ড. মোশাররফ

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ঢাকাস্থ চরফ্যাশন-মনপুরা জাতীয়তাবাদী ফোরামের উদ্যোগে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘যদি দেখি ৫ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার জামিন হয়নি, তাহলে বুঝতে হবে শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে তার মুক্তি না-ও হতে পারে। ৫ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে, এরপরে এদেশে শুধু এক দফার আন্দোলন হবে। তা হবে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আন্দোলন।’ সরকার পতনের সেই আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আন্দোলনের উপযুক্ত সময় এখনো আসেনি: মওদুদ

এদিকে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবেই ২০ দল শরিক লেবার পার্টির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘দেশের মানুষ আন্দোলনের জন্য অনেক চাপ দিচ্ছে। কর্মসূচি সময়মতো দেব। আমি মনে করি এখনো আন্দোলনের উপযুক্ত সময় আসেনি।’

LEAVE A REPLY