বাম্পার ফলনেও লাভ নিয়ে শঙ্কিত মৌলভীবাজারের কমলা চাষীরা

এ বছর মৌলভীবাজারে প্রতি হেক্টরে কমলার উৎপাদন হয়েছে ৬ টন। তবে পোকার আক্রমনে পাকার আগেই গাছ থেকে ঝড়ে পড়ছে কমলা। এতে কমলা চাষীরা বাম্পার ফলনের পরও আশানুরুপ লাভ নিয়ে শঙ্কিত।

মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার গোয়ালবাড়ি ইউনিয়নের কমলা বাগানের গাছে গাছে থোকা থোকা কমলা ঝুলে আছে। ইতিমধ্যে পুষ্ট ফল পেড়ে বিক্রিও শুরু করেছেন কৃষকরা। তবে গান্ধি পোকা ও প্রজাপতির মতো এক ধরণের পোকার আক্রমনে পরিপূর্ণ হওয়ার পূবেই গাছ থেকে ঝড়ে পড়ছে ফল। কাজে আসছেনা কৃষি বিভাগের পরামর্শও জানান, জুড়ি গোয়ালবাড়ি ইউনিয়নের সফল কমলা চাষী মোরশেদ মিয়া।

সরজমিনে জুড়ির গোয়ালবাড়ি ইউনিয়নের কমলা বাগানে গিয়ে দেখা যায় গাছে গাছে ঝোপা ঝোপা কমলা। কোন গাছে কাঁচা কোন কোন গাছে পাকা শুরু হয়েছে। কৃষকরা হালকা পাকা কমলা পাড়ছেন। গাছের নিচে পোকা মারার জন্য বিভিন্ন ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে।

এ সময় হালকা পাকাবস্থায় কমলা পাড়ার কারন জানতে চাইলে কৃষক মোরশেদ মিয়া, মানিক মিয়া ও জয়নুল মিয়া জানান, কমলা পাকা শুরু হলেই এক ধরনের পোকা কমলায় বসে রস খেয়ে নেয় এবং যেখানে বসে ওই জায়গায় পঁচন ধরে। তাই তারা হালকা পাকা কমলা পারছেন। কৃষি বিভাগের পরামশ্যে তারা বিভিন্ন ফাঁদ ব্যবহার করছেন কিন্তু তা তাদের কাজে আসছেনা।

এদিকে মৌসুমের শুরুতে গাছে সেচ না দিতে পারায় বেশ কিছু গাছে ফলের আকার ছোট হয়েছে। অন্যদিকে রাস্তাঘাটের সমস্যায় ফল পরিবহনে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় বলে জানান, অপর কমলা বাগানের মালিক মানিক মিয়া ও অজু মিয়া। তারা জানান, কয়েক বছর পূর্বে তাদের বাগানে চোরেরও উপদ্রব ছিলো। তবে বর্তমান জুড়ি থানার ওসি মো: জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করায় তা কমেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি কমলা তারা ১২০ টাকা দরে বিক্রি করছে। আগামী মৌসুমের আগে সরকারী ভাবে সেচ মেশিন, সার ও পোকাদমনের কার্যকরি পদ্ধতি দিলে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবেন বলেও তারা জানান।

এ ব্যাপারে জুড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মো: জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার জানান, সিলেটের কমলার একটি সুনাম রয়েছে। এ জেলার অন্যান জায়গায় কমলার আবাদ ক্রমশ কমছে। বর্তমানে জুড়ি উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের কৃষকরা বানিজ্যিক আকারে চাষাবাদ ধরে রেখেছেন। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কমলা বাগান দেখতে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় দিনে ও চাষিরা যেন নিরাপদে চাষাবাদ করতে পারেন তাই রাতেও টহল জোরদার রেখেছেন।

জুড়ি উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রনি সিংহ জানান, গোয়াল বাড়িতে প্রায় ৬৫টি কমলা বাগান আছে। এখানে তারা মাঠ পর্যায়ে কৃষদের নিয়ে দল গঠনের মাধ্যমে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে তাঁরা পোকা দমনে ফেরেমেন ফাঁদ কীটনাষক ছিঠানো নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন। পানির সংকট রয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে বর্তমানে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ (কারেন্ট) আসায় সেচ ব্যবস্থা সুবিধা হবে বলে জানান।

জেলার সর্বাধিক উৎপাদনকারী জুড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অসীম চন্দ্র বনিক জানান,মালামাল পরিবহনে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পোকাদমনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও সেচ ব্যবস্থাসহ কমলা উৎপাদনের প্রতিবন্ধকতা দূরিকরণে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি জানান, এ উপজেলায় ছোটবড় মিলিয়ে শতাধিক কমলা বাগান রয়েছে। যার বেশিভাগই বন বিভাগের জমিতে ভিলেজাররা করেছেন। এই মাটি স্থানীয় উন্নত জাত নাগপুরি ও খাসি কমলা চাষের উপযোগী। এই এলাকার কমলা অনান্য জায়গার চেয়ে একটু মিষ্ঠি বেশি হয়ে থাকে। তিনি বলেন জুড়ির কমলা খুব দ্রুত পাকে এবং এক ধরনের পোকার আক্রমনে অল্প সময়ে ঝড়ে যায়। এ বিষয়টি গবেষকদের মাধ্যমে প্রতিকারের পথ বেরকরার জন্য তিনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনবেন বলে জানান। তাছাড়া বনবিভাগ, কৃষি বিভাগ, কৃষক, জনপ্রতিনিধি সকলের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জুড়ি ঐতিহ্যবাহি এ কমলা চাষ ধরে রাখার প্রয়াস তিনি অব্যাহত রেখেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক লুৎফুল বারি জানান, ছোট বড় মিলিয়ে মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ১৪৬টি কমলা বাগান যার আয়তন ১৭৮ হেক্টর। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় জুড়ি উপজেলায়। তিনি জানান কয়েক বছর ধরে কমলার রোগ ও পোকামাকর দমনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। তিনি আরও জানান, তারা সুষম উৎপাদন পদ্ধতি কৃষকদের জানিয়ে দিয়েছেন যারা তা পালন করেছেন তাদের ফলন ভালো হয়েছে।

সিলেটের ঐতিহ্য সিলেটি কমলা উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাস্তবতা নিরিখে প্রয়োজন ব্যবস্থা নিবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, এমনটাই চাওয়া এ এলাকার কমলা চাষীদের।

source: ভোরের কাগজ

LEAVE A REPLY