মেননের বিস্ফোরক মন্তব্যের পেছনে হতাশা না অন্য কিছু

জোটে আছেন, সরকারে নেই। নেই মন্ত্রিত্ব। দলে ভাঙনের আশঙ্কা। এ নিয়ে আছে তীব্র হতাশা। এই হতাশার আগুনে ঘি ঢেলেছে ক্যাসিনোকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ। সব মিলিয়ে সময়টা ভালো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বিতর্ক উসকে দিলেন নিজেই। রাজনৈতিক অঙ্গনের কৌত‚হলী দৃষ্টি এখন তার দিকে। সমালোচনা হচ্ছে মাঠে-ময়দানে। সরকারপক্ষ বলছে, ক্যাসিনোকাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে তাকে। আর শুদ্ধি অভিযানের সময় বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের হাতে ইস্যু তুলে দেয়া মন্তব্য রাজনৈতিক সুবিধাবাদের পরিচয় বলে মনে করছেন খোদ ১৪ দলের নেতারাই। তবে মন্তব্যের একদিন পর বোল পাল্টে তিনি দাবি করেছেন তার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশ বিশেষ উত্থাপন করায় এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ১৪ দলীয় জোটের এই নেতা ঢাকা-৮ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। বিগত সরকারে প্রথমে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং পরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ছিলেন মেনন। গত শনিবার বরিশালে এক অনুষ্ঠানে একাদশ নির্বাচনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমিও নির্বাচিত হয়েছি। তারপরও আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এমনকি পরবর্তী সময়ে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ। একদিকে সরকার উন্নয়ন করছে, অন্যদিকে সরকারের আশপাশের লোকজন দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে। এতে সরকারের উন্নয়ন ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। ক্যাসিনো পরিচালনাকারীরা শত শত কোটি টাকা কামাই করে ও খেলাপি ঋণের টাকা বিদেশে পাঠিয়ে সেকেন্ড হোম বানিয়েছে। দেশের কোটি কোটি টাকা তারা বিদেশে পাচার করেছে।
মেননের এমন বিস্ফোরক মন্তব্যে তোলপাড় রাজনৈতিক অঙ্গন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার হতাশা, ক্যাসিনোকাণ্ডে নাম আসায় সমালোচিত ছিলেন মেনন। এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত সম্রাট জানিয়েছে, তার কাছ থেকে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা মাসোহারা নিতেন ইয়ংমেনস ক্লাবের সভাপতি মেনন। চলমান অভিযানে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে এমন ধারণা অনেকেরই। ফলে আগে থেকেই সরকারের সঙ্গে একটা বিরোধ তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা, যেন মনে হয়, সরকারের বিপক্ষে কথা বলায় তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে নিজ দলে ভাঙন। একপক্ষ সরকারপক্ষে। বিক্ষুব্ধ পক্ষকে খুশি করতেই তুরুপের তাস নির্বাচন নিয়ে নতুন কথার খেলায় মেতেছেন। আর মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার দুঃখ একাদশ সংসদ শুরু থেকেই ছিল। সংসদে প্রথম দিনেই বিতর্কিত বক্তব্য ছিল তার। তবে মেনন মন্ত্রী হলে নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য দিতেন কি না সেই প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী বলেন, তিনি যদি বলেই থাকেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে এতদিন পরে কেন? এই সময়ে কেন? নির্বাচনটা তো অনেক আগে হয়ে গেছে। আরেক প্রশ্ন সবিনয়ে মন্ত্রী হলে কি তিনি এ কথা বলতেন? ক্যাসিনোকাণ্ডের পর একটি ক্লাবের সঙ্গে মেননের সম্পৃক্ততার কথা ওঠার ক্ষোভে তিনি এসব কথা বলছেন কিনা জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ওই প্রশ্নটা তাকে করেন, তিনি কেন ক্যাসিনোকাণ্ডের পর এ কথা বললেন। ইলেকশনের পর কেন বললেন না। মেনন কেন এ বক্তব্য দিয়েছেন, তা আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাছে জানতে চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়ার্কার্স পার্টির এক শীর্ষ নেতা জানান, এটা মেননের মন্ত্রী না হওয়ায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। প্রথমে তারা ১৪ দলেই থাকতেই চায়নি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক কারণে সম্ভব হয়নি। দলের সভাপতির বক্তব্য অবশ্যই দলেরই বক্তব্য।
ক্যাসিনোকাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন মেনন : র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক রথী-মহারথীর নাম জানিয়েছেন বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। সম্রাট জানান, রাশেদ খান মেননকে প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিতেন। ইয়ংমেনস ক্লাব থেকে র‌্যাবের উদ্ধার করা চাঁদাবাজির খাতায় মেননের নাম রয়েছে ৫নং সিরিয়ালে। অবশ্য মেননের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি থাকাকালেও মেননের বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ক্যাসিনোকাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে রাশেদ খান মেননকে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে যুবলীগ নেতারা যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে তিনি চাঁদা নিতেন বলে খবর এসেছে। বিষয়গুলো তদন্ত হচ্ছে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, রাশেদ খান মেনন নিজেও এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। উনি কিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন সেটা কি বলেছেন তিনি? জোটের আরেক শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, শুদ্ধি অভিযানের সময় এ ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক সুবিধাবাদীর পরিচয়। শেখ হাসিনা যখন নিজ দলে শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন তখন জোট সঙ্গীদের এমন বক্তব্য সুবিধাবাদীর পরিচয় বহন করে। আমি এটা সমর্থন করি না।
অন্যদিকে মেননের বক্তব্যকে নিজেদের অভিযোগের পক্ষে বড় প্রমাণ হিসেবে দেখছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, দেরিতে হলেও মেনন এটা করেছেন। আমি খুশি। আর মেননের মন্তব্যকে মহাসত্য বলেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, নিশিরাতের সরকারের সঙ্গী রাশেদ খান মেনন যে কোনো কারণেই হোক, এবার নিজের মুখে মহাসত্যটি স্বীকার করেছেন।
আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন হয়নি : বিগত নির্বাচন প্রসঙ্গে বরিশালে দেয়া বক্তব্য জাতীয় রাজনীতি ও ১৪ দলের রাজনীতিতে একটা ভুল বার্তা গেছে মন্তব্য করে গতকাল রবিবার পাঠানো এক বিবৃতিতে রাশেদ খান মেনন বলেন, আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশ বিশেষ উত্থাপন করায় এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ওই বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, একাদশ সংসদের সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতাটি সুখকর নয়। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে এলেও নির্বাচনকে ভণ্ডুল করা, নিদেন পক্ষে জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল প্রয়োগ করেছে। এটা যেমন সত্য তেমনি এ ধরনের পরিস্থিতিতে অতি উৎসাহী প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বাড়াবাড়ি করতে পারে। কিন্তু তাতে এই নির্বাচন অশুদ্ধ বা অবৈধ হয়ে যায় না। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, এ যাবতকালের নির্বাচন ১৪ দলের সংগ্রামেরই ফসল এবং সরকারও গঠিত হয়েছে ১৪ দলের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা মোকাবেলায় ১৪ দলের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।

source: ভোরের কাগজ

LEAVE A REPLY