ভোটের মাঠে: চন্দনাই অলি বনাম বিভক্ত আ.লীগ

সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া শঙ্খ নদী। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনের দুই অংশকে বিভক্ত করেছে নদীটি। ছবি: সৌরভ দাশ

‘দোহাজারী সড়ক বিভাগ’। ৬৪ জেলার ৬৫তম সড়ক ও জনপথ (সওজ) কার্যালয় এটি। চন্দনাইশ উপজেলার এই কার্যালয় নিয়ে সওজ কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো বিস্মিত। একটি উপজেলায় (দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য) পৃথক সওজ কার্যালয় করার ঘটনা ১৯৯২ সালেই প্রথম এবং শেষ। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী অলি আহমদ কতটা প্রভাবশালী ছিলেন, তা এ ঘটনায় বোঝা যায়।

অলির ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্ব চন্দনাইশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। রোববার সকালে চন্দনাইশের বরমা ইউনিয়নের বাসিন্দা মঞ্জুরুল আলম সমীহ করে বলেই ফেললেন, ‘অলি পুরোনো পাপী (ভালো অর্থে)। উনি জানেন, কীভাবে ভোট হবে। এখানে আওয়ামী লীগ এক না হলে বিপদে পড়বে।’

বরমা কালীর হাটের বিখ্যাত মা কালী মিষ্টি ভান্ডারে পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে মঞ্জুরুল আলম বিশেষজ্ঞের মতো বলে যাচ্ছিলেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে আলাপ শুনে দোকানের কর্মচারীটিও থমকে দাঁড়ায়। ১০ বছর আগে শেষবার এখানকার মানুষ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। তাই মানুষের একটু আগ্রহ বেশি। ২০১৪ সালে এখানে (চট্টগ্রাম-১৪) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সাংসদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

চন্দনাইশ উপজেলার ৮ ইউনিয়ন ও ২ পৌরসভা এবং পাশের সাতকানিয়া উপজেলার ৬ ইউনিয়ন নিয়ে এই আসন। ১৯৯১ থেকে টানা ২০১৪ পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন অলি আহমদ। কখনো বিএনপি কখনোবা এলডিপির হয়ে তিনি নির্বাচন করেন। এই সময়কালে এলাকায় তাঁর উন্নয়নের চিত্র এখনো চোখে পড়ে।

পথে পথে অলি আহমদের নামে নামফলক এখনো দেখা যায়। শুধু সওজ কার্যালয় নয়, এখানে প্রথম পৌরসভা হয় অলির হাত ধরে। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত পৌরসভাটির নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর এবং ভবনের উদ্বোধনের নামফলকও এখনো শোভা পাচ্ছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ দলীয় পৌর মেয়র মুহাম্মদ মাহবুবুল আলমও অলির উন্নয়নের কথা স্বীকার করলেন।

এই মেয়র বললেন, ‘অলি সাহেব মন্ত্রী থাকার সময় অনেক উন্নয়ন করেছেন। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর বিচরণ কম। এলাকায়ও এখন কম সময় দেন। তারপরও তিনি শক্ত প্রার্থী। ২৩ জন মনোনয়ন চাইলেও প্রার্থিতা ঘোষণার পর আশা করি আমরা (আওয়ামী লীগ) এক হয়ে যাব।’

পৌর সদরে দেখা হয় বরকল ইউনিয়ন পরিষদের দুই সদস্যের সঙ্গে। মোহাম্মদ জামাল হোসেন ও রূপম বিশ্বাস কোনো কাজে সদরে আসেন। পৌর সদরের বাসিন্দা মো. শাহদাতসহ কথা বলছিলেন। শাহদাত বলেন, ‘অলি কোন দল, সেটা বড় কথা নয়। তিনি নিজেই একটা দল।’

রূপম বিশ্বাস বলে গেলেন একনাগাড়ে, ‘বর্তমান সাংসদই মনোনয়ন পাবেন। কিন্তু লড়াই করতে হবে।’

চট্টগ্রাম–১৪ আসনে আওয়ামী লীগের তিনটি পক্ষ। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও উন্নয়নে অলি আহমদের ভূমিকার কথা স্বীকার করেন।

পাশে থাকা জামাল হোসেন যোগ করলেন, ‘তবে এত উন্নয়নের পরও মানুষের মধ্যে শান্তি নেই। একমাত্র কারণ হাইব্রিড নেতারা।’

নজরুল ইসলাম ছাড়াও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আবু আহমেদ প্রার্থী হয়েছেন। কয়েক মাস আগে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এলডিপি নেতা আবদুল জব্বার চৌধুরী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তিনিও মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তাঁর ভাই আবদুল কৈয়ম চৌধুরীও মনোনয়ন ফরম কেনেন।’

এখানে আওয়ামী লীগের তিনটি ধারা। একটি ধারার নেতৃত্ব দেন বর্তমান সাংসদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

চলতি বছর উপজেলার দোহাজারী ইউনিয়নকেও পৌরসভায় উত্তীর্ণ করা হয়েছে। চন্দনাইশ সদর থেকে নতুন পৌরসভার দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী গিয়ে শেষ হয়েছে রেললাইন। এই রুটে সম্প্রতি নতুন আরেক জোড়া ট্রেনও উদ্বোধন করা হয়। দোহাজারী স্টেশন থেকে দক্ষিণে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন বিস্তৃত হচ্ছে। শঙ্খ নদের ওপর নতুন সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়াও শুরু হবে শিগগিরই।

চন্দনাইশ ও সাতকানিয়াকে সংযুক্ত করেছে দোহাজারী এলাকায় শঙ্খ নদের ওপরের বিদ্যমান সেতুটি। এই সেতুর দক্ষিণে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সঙ্গে যুক্ত সাতকানিয়ার ছয় ইউনিয়ন। আসনের মোট ভোটার প্রায় আড়াই লাখ। এর মধ্যে সাতকানিয়ার ছয় ইউনিয়নের ভোটার প্রায় ৮৬ হাজার। তাঁদের মধ্যে জামায়াত–বিএনপির পাল্লা ভারী বলে মনে করা হয়।

শঙ্খ নদ ছিল চন্দনাইশবাসীর দুঃখ। প্রতি বর্ষায় এখানকার শত শত ঘরবাড়ি বিলীন হতো এই নদে। তবে বর্তমান সাংসদ নজরুল ইসলাম চৌধুরীর আমলে ব্লক দিয়ে বাঁধ তৈরির কারণে এই অবস্থা থেকে মুক্তি মিলেছে বলে দাবি মেয়র মাহবুবুল আলমের।

নজরুল ইসলাম চৌধুরীর বাড়ি পৌর সদরের বাইরে, কাঞ্চননগর ইউনিয়নে। এই কাঞ্চননগরের পেয়ারার খ্যাতি দেশজুড়ে। ভদ্র ও বিনয়ী হিসেবে বর্তমান সাংসদের সুনাম রয়েছে। তবে উন্নয়ন ও ক্ষমতার দৌড়ে তিনি এখনো অলি আহমদের চেয়ে পিছিয়ে, এমন মত ভোটারদের।

অলি আহমদের ক্ষমতার আরেকটি উদাহরণ তুলে ধরেন কয়েকজন। তাঁরা জানান, চন্দনাইশ ও পটিয়ার বাসিন্দাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব অনেক দিনের পুরোনো। ১৯৯১ সালে বিএনপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ যোগাযোগমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এই দ্বন্দ্ব আরও চরমে পৌঁছায়। পটিয়ার ওপর দিয়ে চন্দনাইশবাসী আর চলবে না, এমন একটি ধুয়ো ওঠে। বিকল্প হিসেবে অলি আহমদ আনোয়ারার ওপর দিয়ে চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করেন।

অলির উন্নয়নবন্দনা তখন থেকেই। ওই সড়ক করার পর দীর্ঘদিন ধরে পটিয়াকে জেলা ঘোষণা করার দাবি অনেকটা হোঁচট খায়। ১৯৭৬ সালে পটিয়া থেকে ভেঙে চন্দনাইশকে পৃথক থানা করা হয়েছিল।

LEAVE A REPLY