ফের শঙ্কায় পোশাক খাত

গার্মেন্টস শ্রমিক/ফাইল ছবি

* ইউরোপ-আমেরিকায় করোনার সেকেন্ড ওয়েভ
* ক্রয়াদেশ আসার হার শ্লথ হওয়া শুরু হয়েছে

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে করোনার প্রকোপ আবার বাড়ছে। অর্থনীতি বাঁচাতে লকডাউন না দিলেও ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আবারো কড়াকড়ি আরোপ করছে কয়েকটি দেশের সরকার। এ জন্য তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে নানামুখী হিসাব-নিকাশ করছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডগুলো। তাতে পোশাকের ক্রয়াদেশ আসার হার কিছুটা শ্লথ হওয়া শুরু হয়েছে। অবশ্য বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব এখনো পড়েনি। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন পোশাকশিল্প মালিকরা। ইতোমধ্যে কারখানাগুলোকে সতর্ক করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। পোশাকশিল্পের মালিকরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে গত মার্চের মতো পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ভাইরাসটির সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেটি হলে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলো নতুন করে সংকটে পড়বে।

বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, আমরা যেসব দেশে ব্যবসা করছি তারা যদি সমস্যায় থাকেন, আর আমরা যদি ভালো অবস্থানে থাকি তাতে কোনো লাভ নেই। তাই বহির্বিশে^র সঙ্গে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বসবাস করতে পারছি না। আমরা পুরোপুরি তাদের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং দ্বিতীয় ধাপে করোনা আক্রান্ত হলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হব। তিনি বলেন, সামনে ক্রিসমাস। এ মুহূর্তে যদি করোনার প্রভাব আবার বেড়ে যায় তাহলে আমাদের ক্রয়াদেশের ওপরও একটা বড় প্রভাব পড়বে। আমরা শুনেছি, করোনা মোকাবিলায় ভ্যাকসিন বের হবে। তাহলে হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু সে আশা সফলতা পাচ্ছে না। তাই কিছুটা আতঙ্কের মধ্যে তো থাকতেই হচ্ছে।

জানা গেছে, করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ইতোমধ্যে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর মধ্যে আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের ওয়েলসে নতুন করে লকডাউন কার্যকর হয়েছে। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে জার্মানির বাভেরিয়া রাজ্যের একটি জেলায় লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। বেলজিয়াম গত সোমবার থেকে ১ মাসের জন্য বার ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিয়েছে। ইতালিও একই পদক্ষেপ নিয়ে মানুষকে যতটা সম্ভব ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে। পোল্যান্ডের প্রায় অর্ধেক অংশ ‘রেড জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে বদ্ধ জায়গায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। গত সপ্তাহ থেকে প্যারিসসহ ফ্রান্সের ৯টি শহরে সারারাত কারফিউ জারি করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ৪ সপ্তাহের জন্য প্যারিস এবং আরো ৮ শহরে রাতের বেলা কারফিউ জারির ঘোষণা দিয়েছে। স্পেনে হঠাৎ করে আবারো বেড়েছে করোনা সংক্রমণ। সংক্রমণ কমাতে দেশটির মন্ত্রিসভা ১৫ দিনের জরুরি অবস্থা জারির নির্দেশ দিয়েছে। সেøাভাকিয়ায় গত ১৩ অক্টোবর থেকে ৬ জনের বেশি মানুষ জমায়েত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্র ৩ সপ্তাহের

আংশিক লকডাউনে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় ধাপে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ধাপ আমাদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, যে বাজারে আমরা রপ্তানি করছি, সেখানে নতুন করে আক্রান্ত হলে পোশাকের চাহিদা কমে যাবে। আর চাহিদা কমলেই অর্ডার কমে যাবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সালাম মুর্শেদী বলেন, আমরা মাত্র ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি। এই মুহূর্তে যদি আবার সেকেন্ড ওয়েভ আসে তাহলে তা আমাদের আগামীর সময়ের ব্যবসার জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই ক্ষতি মোকাবিলায় বর্তমানের মতো করে সরকারকে পাশে থাকার আহŸান জানান তিনি। তবে করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে ব্যবসা অনেক ভালো হচ্ছে বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে করোনা ছড়িয়ে পড়লে গত মার্চে পোশাক খাতে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিতাদেশ আসতে থাকে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, তখন প্রায় ৩১৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির ক্রয়াদেশ প্রাথমিকভাবে বাতিল ও স্থগিত হয়। পরে অবশ্য স্থগিত হওয়া ক্রয়াদেশ ফিরতে শুরু করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ভারত ও মেক্সিকোর কমেছে এক-তৃতীয়াংশ। ইন্দোনেশিয়ার কমেছে ২১ শতাংশের কাছাকাছি। সেই হিসাবে এখনো ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম ৮ মাস জানুয়ারি-আগস্টে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে সাড়ে ১৪ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে শুধু ভিয়েতনাম, দেশটির রপ্তানি কমেছে ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। করোনা ভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা গত মার্চ থেকে পোশাক আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। তাতে সব দেশেরই ব্যবসা কমেছে। এদিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে চলমান শীত মৌসুমের পোশাক গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে রপ্তানি হয়েছে। বর্তমানে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের ক্রয়াদেশ আসার সময়, যা আগামী ডিসেম্বর থেকে রপ্তানি শুরু হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত করোনা মহামারি মোকাবিলা করে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। এমন সময় করোনার সেকেন্ড ওয়েভ এ খাতের ওপর কিছুটা হলেও প্রভাব পড়েছে। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। সংক্রমণ খারাপের দিকে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়টি আমরা সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। নতুন করে ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিতাদেশের মুখোমুখি যেন না হতে হয়, বর্তমানে সেই প্রত্যাশাই করছি। তিনি বলেন, সেকেন্ড ধাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার অনেক সচেতন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে মাস্ক ব্যবহার করতে বলেছেন এবং অবশ্যই তিনি নিজেও কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করছেন। আশা করছি নিয়ম-কানুন মেনে চলতে পারলে আমাদের দেশে সেকেন্ড ওয়েভ খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের দেশের জনগণ নিয়ম মেনে চলবে।

এর আগে চলতি বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর বড় ধাক্কা লাগে তৈরি পোশাকশিল্পে। সংক্রমণ রোধে টানা ১ মাস বন্ধ ছিল কারখানা। কারখানা খোলার জন্য সতর্কতামূলক নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও এড়ানো যায়নি সংক্রমণ। সরকারি এক সংস্থার তথ্যমতে, মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশের শ্রমঘন শিল্প খাতের শ্রমিকদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬ জন। তাদের মধ্যে ৪ জনই ছিলেন পোশাকশিল্পের। এ অবস্থায় দ্বিতীয় ঢেউ এলেও যাতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সে জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা।
গত ৫ অক্টোবর সব সদস্যের উদ্দেশে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সেখানে বলা হয়, দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রকোপ এখনো চলমান রয়েছে। আসন্ন শীত মৌসুমে এ ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় কোনো কারখানায় কর্মরত কোনো শ্রমিক/কর্মকর্তা/কর্মচারী করোনা রোগী হিসেবে শনাক্ত হলে তাদের রিপোর্ট বিজিএমইএকে অবহিত করতে হবে। সদস্যদের কোভিড সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, আমরা শুধু সাবধানতা অবলম্বন করছি এবং কারখানাগুলোকে সতর্ক করছি।

এদিকে বিকেএমইএ সূত্র জানিয়েছে, করোনার কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর সীমিত আকারে কারখানা চালুর দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। তবে এখন আর সীমিত আকারে কারখানা চালু রাখার কোনো পথ নেই। এমনিতেই অনেক কারখানা বন্ধ। অনেকে আবার সচল থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে নেই। এ পরিস্থিতিতে কারখানাগুলোতে মৌলিক কিছু বিষয় অনুসরণের বিষয়ে তাগিদ দেয়া হচ্ছে। যেমন হাত ধোয়া, স্যানিটাইজ করা, পরিচ্ছন্ন থাকা প্রভৃতি।

বিকেএমইএ প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কোভিড মোকাবিলায় সীমিত আকারে কারখানা সচল রাখার বিষয়টি এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। তবে মৌলিক বিষয়গুলো কঠোরভাবে অনুসরণে কারখানাগুলোয় কিছুটা ঢিলেঢালা ভাব দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় এ বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে অনুসরণের তাগিদ কারখানা কর্তৃপক্ষগুলোকে দেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, গত ২৩ মে পর্যন্ত কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৭০। এরপর গত ১ জুন এ সংখ্যা বেড়ে হয় ২৫১। সর্বশেষ ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্ত শ্রমিকের সংখ্যা ৪৭৯। আক্রান্ত শ্রমিকরা বিভিন্ন খাতের মোট ২০৪টি কারখানার সঙ্গে যুক্ত, যার ১০৯টিই পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য কারখানা। এ প্রেক্ষাপটেই কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে শিল্প মালিক প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলো। এসএইচ

LEAVE A REPLY