বাঁশকে খাদ্য নয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও শিল্প ভাবুন

বাঁশের কোড়ল

বাঁশের কোড়ল বা চাড়া খাদ্য হিসেবে দেশের পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠির বেশ প্রিয়। শুধু বাঁশ নয় তাদের কাছে প্রিয় কাকড়া, ব্যাঙ, সাপ, গুইসাপসহ বেশকিছু পোকাও। তাদের খাদ্যাভাস ও রান্নার প্রণালীও আমাদের সাধারণ জনগোষ্ঠির চেয়ে ভিন্ন। এটি নুতন নয়। সে কারণে আমরা সাপ, ব্যাঙও খাই না। খাবার চেষ্টা করি না। কিন্তু তাদের প্রিয় খাবার বাঁশ খেতে চাই…যুক্তি হিসেবে এসব বাঁশ বিক্রয়ের প্রমোটররা স্বাদ আর উপকারী দিকের কথা তুলে ধরেন।

তবে তারা যেভাবে জীবন যাপন করেন আমরা তা পারি না বা করি না। এই ধারা স্বাভাবিক। তবে গৃহ নির্মাণ থেকে শুরু করে আমাদের গ্রামীণ বসতি স্থাপন ও ঘর গৃহস্থালী কাজে নিত্য ব্যবহার্য উপকরণ বাঁশ। কাগজ উৎপাদনে একটি গুরুত্ব কাঁচামালও বাঁশ। অর্থকরী উদ্ভিদও বটে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাঁশকে রীতিমতো রপ্তানি পণ্যের মর্যাদার জায়গায় দাঁড় করেছে আমাদের অনুসরণীয় দেশ চায়না।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই সময়ে আমরা আদি গোষ্ঠির অনুকরণে বাঁশকে খাদ্যে রূপান্তরের চেষ্টা চালাচ্ছি কেউ কেউ। এমনিতেই আদি গোষ্ঠির প্রিয় খাবারের তালিকায় বাঁশ কোড়ল থাকায় প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ বাঁশ শিশুবেলায়ই সাবাড় হচ্ছে। পাহাড়ি অবাধে উজাড় হচ্ছে বাঁশবন। এতে শত শত কোটি টাকার প্রাকৃতিক বা বনজ সম্পদ মূলত কোনো কাজে আসছে না। তবে- আদিবাসিদের যাপিত জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এই ধ্বংসাত্মক খ্যাদ্যাভাস কিছুটা হলেও মেনে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রকৃতি রক্ষার যে স্লোগান দিনের পর দিন জারি আছে- উপযুক্ত হবার আগেই, শিশুবেলায়ই বাঁশচাড়া বা বাঁশের কোড়ল খেয়ে ধ্বংস করার যৌক্তিকতা ধোপে টেকে না।

একটি শিশু বা চাড়া বা কোড়লের দাম পাহাড়ে ১০/১২ টির আটি ৮০-১০০ টাকা। সে হিসেবে প্রতিটির দাম ৮-১০ টাকা। কিন্তু চাড়াবাঁশ বড় বা পূর্ণ বয়ষ্ক হলে এর প্রতিটির দাম পড়বে ৮০-২০০ টাকা। অর্থাৎ শিশুবেলায় বা উপযুক্ত হবার আগেই কোড়ল খেয়ে ফেলায় প্রতিবাঁশে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে ৮ থেকে ২০ গুণ।

তো, নতুন করে যদি বাঁশকে আমাদের সাধারণের খাদ্য তালিকায় জায়গা করে দেয়া হয় তবে পাহাড়ের বাঁশ উজাড় হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তারপর সে তালিকায় বেনিয়ারা যুক্ত করবেন দেশের সমতলের বাঁশ। সাবাড় হতে থাকবে বাঁশঝাড় সমূলে। কারণ- বাঁশ কিন্তু প্রতিদিন বা প্রতিমাসে জন্মায় না। জন্মায় বছরে একবার মাত্র। আর উপযুক্ত হতে সময় লাগে আর ৬-১২ মাস।

দেশে এত সবজি থাকতে- বাঁশ খাবার যুক্তিটা কি? নতুনত্ব? চায়নারা খায় বলে? তারা তো মেলা কিছু খায়। আপনারা খান? তাছাড়া- চায়নারাও এই সময়ে বাঁশকে উপযুক্ত করে প্রযুক্তির ছাঁচে ফেলে নানা আকর্ষণীয় উপকরণ বানিয়ে নিজেরা ব্যবহার করছেন। রপ্তানি করছেন সারা দুনিয়ায়।

অথচ আশ্চর্য বিষয়, যারা কথায় কথায় সুন্দরবন ধ্বংসের আওয়াজ তোলেন, প্রকৃতিপ্রেমিক হিসেবে নিজেদের জাহির করেন, কোথাও বয়সি গাছ কাটা পড়লে হৈ হৈ করে ওঠেন- তারাও ফেসবুকে খাদ্য হিসেবে বাঁশ কোড়লের গুণকীর্তণ করেন। প্রকাশ্যে বাঁশের চাড়া খেয়ে ঠেকুর তুলবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অন্যদের বাঁশ কোড়ল খেতে উদ্বুদ্ধ করতে-দাম, রেসিপি জানান।

সুতরাং ‘বাঁশ কোড়ল খান এর গুণের শেষ নেই, পৃথিবীর সব চেয়ে সুস্বাদু খাবার বাঁশ কোড়ল’ -এই জাতীয় বিজ্ঞাপন নিয়ে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রকৃতি ধ্বংসের অভিযোগ আনা উচিত। প্রয়োজনে আইন করে এখনি বন্ধ করা উচিত বাঁশ সম্পদ ধ্বংস করার এই দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড।

তা না হলে- এক সময় হয়তো বাঁশ নিয়ে করা হাসি-তামাশাই হবে বাঁশসম্পদের কাল! পিআর

LEAVE A REPLY