যে হামলার ক্ষত সারেনি আজও

হামলার পৌনে দুই ঘণ্টার মাথায় ধসে পড়ে টুইন টাওয়ার। ছবি: রয়টার্স

দেখতে দেখতে নাইন-ইলেভেন পার করতে চলেছে ১৯ বছর। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন টার্গেটে আত্মঘাতী হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ছিনতাই করে ৪টি যাত্রীবাহী বিমান। এদের মধ্যে দুইটি বিমান আঘাত হানে নিউ ইয়র্কের আইকনিক টুইন টাওয়ারে। আর তৃতীয় বিমানটি আছড়ে পরে আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনে। অবশ্য লক্ষ্য চ্যুত হয় চতুর্থ বিমান হামলা। সেটি আছড়ে পড়ে পেনসিলভানিয়ার একটি খোলা মাঠে। আর এই ঘটনা সারা বিশ্বে নাইন-ইলেভেন নামে পরিচিত। ৯/১১ হামলায় প্রাণ যায় প্রায় তিন হাজার মানুষের। আর এই ঘটনার পর বিশ্ব রাজনীতি অনেকটাই পাল্টে যায়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমেরিকা নিজেই জড়িয়ে পড়ে যুদ্ধ আর সংঘাতের দিকে।

মার্কিন তদন্ত বলছে, আত্মঘাতী হামলাকারীরা ছিলো সৌদিসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশের নাগরিক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ছিল এই আক্রমণের পৃষ্ঠপোষক। আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন তখন পলাতক। এত বড় একটি পরিকল্পিত হামলার পেছনে আল-কায়েদার তিনটি প্রধান কারণ ছিলো বলে জানা যায়। এগুলো হল ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকার বাড়াবাড়ি রকমের সমর্থন, পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণ ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান অব্যাহত রাখা।

২০০১ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে আত্মঘাতী বিমান হামলা চালানো হয়। ছবি: রয়টার্স

নিখুঁত পরিকল্পনায় হামলার ছক কষেছিল আল কায়দা ও তার মিত্ররা। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গোপন বৈঠক করা হয়। মূল পরিকল্পনা সাজাতে বৈঠক হয় মালয়েশিয়ায়। হামলাকারীরা মার্কিন ফ্লাইটগুলোর পর্যাপ্ত খোঁজখবর নিতে থাকেন। এছাড়া জার্মানির হামবুর্গে আল কায়দার একটি সমন্বয়কারী দল ছিল। এই হামলার টাকা এসেছে দুবাই থেকে। আত্মঘাতী হামলাকারীদের সংগ্রহ করা হয়েছিল সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। সবকিছুর পর্যবেক্ষণে ছিলেন আফগানিস্তান থেকে আলকায়দা নেতারা। সর্বোপরি ওসামা বিন লাদেন। জার্মানির, হার্মবুগ থেকে চারজন প্রধান জঙ্গি বৈমানিক ও পরিকল্পনাকারী ছিলো এই হামলায়। তাদের বলা হতো হামবুর্গ সেল। হামলা পরিচালনায় এরাই ছিল মূল নেতৃত্বে। হার্মবুগ সেলের প্রধান হাইজ্যাকারের নাম মোহাম্মদ আতা। তিনি ও তার হামবুর্গ গ্রুপের অন্য সদস্যরা আফগানিস্তানে আসেন ১৯৯৯ সালে। বিন লাদেন ও তার সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ আতেফ প্রথম সাক্ষাতেই বুঝতে পারেন অপারেশন পরিচালনার জন্য আতার নেতৃত্বে পশ্চিমা জিহাদি গ্রুপটি তাদের আফগান জিহাদিদের চেয়ে বেশি চতুর ও প্রশিক্ষিত। তাই মোহাম্মদ আতাকে প্রধান করে পুরো অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ভয়াবহ এই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ মারা যান। ছবি: রয়টার্স

৯/১১ হামলায় সর্বমোট ২৯৯৬ জন মানুষ প্রাণ হারান। এদের মধ্যে হামলাকারী বিমানগুলোতে থাকা ১৯ জঙ্গিও ছিল। জঙ্গিরাও জানতো সফল হলেও তাদের কেউ আর বেঁচে ফিরবে না। নিউ ইয়র্ক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রেই কেবল ২,৭৬৩ জন মানুষ মারা যান। এদের মধ্যে ৩৪৩ জন ছিলেন দমকল বাহিনীর কর্মী ও চিকিৎসক এবং ২৩ জন নিউ ইয়র্ক সিটির পুলিশ কর্মকর্তা ও ৩৭ জন বন্দর পুলিশের কর্মকর্তাসহ ৭১ জন পুলিশ কর্মকর্তা। টাওয়ারে আটকে পড়াদের বের করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারের আশপাশে থাকা লোকজনকে এভাবেই নিরাপদে আশ্রয়ে নিয়ে যান উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: রয়টার্স

আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ সেদিন ফ্লোরিডায় অবস্থান করছিলেন। হোয়াইট হাউজে আক্রমণের জন্য জঙ্গিরা ভুল দিনটিকে বেছে নিয়েছিলো, সন্দেহ নেই। নিরাপত্তার স্বার্থে সেদিন সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বুশ গা ঢাকা দিয়ে থাকেন। রাত নয়টায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক টেলিভিশন বার্তায় তিনি বলেন, “সন্ত্রাসী হামলা আমাদের সুউচ্চ ভবনগুলোর ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে কিন্তু মার্কিন জাতির ভিত্তি তারা স্পর্শও করতে পারবে না। এসব আক্রমণ আকাশচুম্বী ভবনের ইস্পাতকে টলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মার্কিন সঙ্কল্প ইস্পাতের থেকেও দৃঢ়। এ হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয় `অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম। কিন্তু নাইন ইলেভেন হামলার অভিযুক্ত মূল হোতা ওসামা বিন লাদেন ২০১১ সালের মে পর্যন্ত ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওই বছর ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে পালিয়ে থাকা লাদেনকে হত্যা করে মার্কিন নেভি সিলের এক বিশেষ দল।

পিআর

LEAVE A REPLY