কেন এমন ভয়াবহভাবে জ্বলছে আমাজন?

প্রতীকী ছবি।

বিশ্বের বৃহত্তম অরণ্য আমাজন পুরো পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। তাই আমাজনকে পৃথিবীর ফুসফুস বলেই আখ্যায়িত করা হয় । ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অরণ্যের প্রায় ৫৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকাটি মূলত আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা বেষ্টিত। নাম না জানা নানা উপজাতির বাসস্থান সহ আমাজন জঙ্গলে রয়েছে ১৬ হাজার প্রজাতির গাছগাছালি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ দাবানলের শিকার হচ্ছে এটি। বর্তমান আমাজন ও তার প্রাণীকুলের ভয়াবহ দুর্দশা নিয়ে ধারাবাহিক ৩ পর্বের দ্বিতীয় পর্ব আজ।

গ্রীষ্মে আমাজনের মাটি ধীরে ধীরে শুষ্ক এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় ।আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য তখন পুরো পরিবেশটি সম্পূর্ণ রূপে অনুকূলে থাকে । পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আমাজনের জঙ্গলের ভয়াবহ আগুনের কয়েকটি কারণকে যথার্থ ভাবেই চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, বিভিন্ন কারণে গাছ কেটে বনভূমি উজাড় এবং মনুষের বসতি স্থাপন-সহ বিভিন্ন নির্মাণের উদ্দেশ্যে মানুষ নির্বিচারে বনের শতবরষী বৃক্ষ নিধন করে বনভূমিকে ধ্বংস করছে। তার পর বৃক্ষের প্রতিটি অংশ নিশ্চিহ্ন করতে তা শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার সময়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশের জঙ্গলে। যা রূপ নিচ্ছে ভয়াবহ দাবানলের।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে। বসতি বাড়ার ফলে স্থান সঙ্কুলানের অভাব, কৃষিজাত দ্রব্যের জোগান দেওয়ার জন্য মানুষ সরাসরি কোন কিছু বিবেচনা না করেই জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। গবাদি পশুর চারণভূমি তৈরি করার জন্যও একই পন্থা অবলম্বন করছে মানুষ।

তবে ব্রাজিল সরকারের উপরেও এই দায় বর্তায়। কারণ, বর্তমান রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারো সরকার অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বেরিয়ে আসতে জঙ্গল উজাড় করে কৃষি ক্ষেত্র, বসতি এবং শিল্পাঞ্চল গড়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, বলসোনারো সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমাজনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, সন্দেহের তীর ক্রমশই তীব্র হচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক তদন্তকারীদের চাপের মুখে পড়ে গত জুলাই মাসের প্রথম দিকে আমাজন অঞ্চলে আগুন লাগানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ব্রাজিল সরকার।

বিগত কয়েক বছর ধরেই ব্রাজিলের কৃষিখাত শক্তিশালী হওয়ার ব্যাপারো লক্ষ্য করা যাচ্ছে । ব্রাজিল বিশ্বে অন্যতম সয়াবিন উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ব্রাজিলের অন্যতম ক্রেতা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্রাজিলের সয়াবিন রপ্তানি উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বন উজাড় করে নতুন কৃষিজমি তৈরির কাজ।যা পুরোপুরি প্রভাব ফেলছে আমাজনের উপর।

‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড’ ইতিমধ্যেই সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে, বনভূমি ছেদন করতে যেখানে যান্ত্রিক প্রয়োগ ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে মানুষই বনভূমি সাফ করতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। যার ফল— মনুষ্যসৃষ্ট দাবানল।

ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় স্পেস রিসার্চ ইস্টিটিউটের বলছে,গত বছর আমাজন রেইন ফরেস্টে ৭২,৮৪৩টি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। যা বিগত সময়ের তুলনায় যা ৮৩% বেশি। শুধু তাই নয় ২০১৩ এর তুলনায় দ্বিগুণ।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে ইনপে একটি উপগ্রহ ছবি প্রকাশ করে এই তথ্য দেয় যে, সাম্প্রতিক বছরে বন উজাড় আগের বছরগুলোর থেকে প্রায় ২৭৮% শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পশুপাখি।

সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের গবেষক ও জলবায়ুবিজ্ঞানী কার্লোস নোব্রে বলেছেন, গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে জমি ব্যবহার ও পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে শুকনো মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করেন। এ সময় বন দাহ্য হয়ে থাকে এবং খুব সহজেই তাতে আগুন লাগে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তথ্যমতে বিগত পঁচিশ বছরে আমরা আমাজনের মূল আয়তনের প্রায় ১৭% হারিয়ে ফেলেছি। যে হারে ধংসযজ্ঞ চলছে, তাতে আগামী ২০ বছরে পৃথিবীর ফুসফুসের ৫০% কয়লায় রুপান্তর হতে বেশি সময় লাগবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইত্তেফাক/ এএইচপি/এআর

LEAVE A REPLY