স্বর্ণের বাজার কোন পথে?

ফাইল ছবি।

মহামারি করোনা ভাইরাসের আঘাত প্রায় প্রত্যেকটি দেশের প্রতিটি খাতেই লেগেছে। সবকিছুর মূল্যপতন ঘটলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে স্বর্ণের দাম। মূলত, একদিকে মার্কিন-চীন সম্পর্কের অবনতি, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য এখন স্বর্ণ কিনে মজুত করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক দিন ধরেই স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকায় গত সপ্তাহে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২ হাজার ৭৪ ডলারে ওঠে। চলতি বছরে এ নিয়ে ৬ দফায় দাম বেড়ে ২০১১ সালের রেকর্ড ভাঙে স্বর্ণের দাম। ২০১১ সালে সর্বোচ্চ দাম ছিল আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৯২১ ডলার।

তবে গত শুক্রবার ৩৪ দশমিক ১০ ডলার কমে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৩৪ দশমিক ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ দরপতনের পরও সপ্তাহের ব্যবধানে ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং মাসের ব্যবধানে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ দাম বেড়েছে। সামনের দিনগুলোতে দাম আরো বাড়তে পারে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসও। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ২ হাজার ডলারের উপরে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। এদিকে, ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, গত ৩ দশক ধরেই নতুন স্বর্ণের খনি আবিষ্কার কমছে। কিন্তু স্বর্ণের দাম বাড়ায় খনি মালিকরা উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিয়েছেন। গত কয়েক বছরের কাটছাঁটের পর এখন নতুন খনির সন্ধানেও ঝুঁকছেন তারা।

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়ায় এ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে। এ কারণে দেশে এখন প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার ২১৫ টাকা। কিন্তু বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানির ফলে দাম কমার সম্ভাবনা থাকলেও সে সুফল মিলছে না বাজারে। এভাবে দাম বাড়ার ফলে দেশের নি¤œ ও মধ্যবিত্তরা এ ধাতব মুদ্রা কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকেই বিশ্ববাজারে উত্তাপ ছড়ানো স্বর্ণের দাম জুলাই মাসের শেষ অর্ধে এসে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে

থাকে। মহা মূল্যবান এ ধাতুটি গত ২৭ জুলাই অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ দামের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে এবং গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো দুই হাজার ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। অর্থাৎ প্রতি আউন্স সোনার দাম ২ হাজার ৭৪ ডলারে ওঠে। তবে শুক্রবার ৩৪ দশমিক ১০ ডলার কমে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৩৪ দশমিক ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ দরপতনের পরও সপ্তাহের ব্যবধানে ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং মাসের ব্যবধানে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ দাম বেড়েছে। এর মাধ্যমে চলতি বছরে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫০৬ দশমিক ৫৫ ডলার বা ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে। যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

স্বর্ণের সম্ভাব্য বাজার পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস প্রকাশ করে থাকে গোল্ডম্যান স্যাকস। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বৈশ্বিক মন্দায় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকেই নিরাপদ মনে করছে। সংস্থাটি স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ ৩ মেয়াদে স্বর্ণের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দামের প্রাক্কলন করেছে। তারা বলছে, স্বল্প মেয়াদে বা পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৯০০ ডলারে উন্নীত হতে পারে। মধ্য মেয়াদে বা ৬ মাসের মধ্যে মূল্যবান ধাতুটির দাম আউন্সপ্রতি ২ হাজার ডলার হতে পারে। আর দীর্ঘ মেয়াদ বা ১ বছরের মধ্যে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম উঠতে পারে ২ হাজার ৫০০ ডলারে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ৩ কারণে বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের দাম অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। প্রথমত, বিশ্বের অনেক অঞ্চলে করোনার রেকর্ড সংক্রমণের কারণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এতে দরপতন ঘটছে শেয়ারবাজারে। তাই অস্থির এ সময়ে ব্যবসায়ীরা নিরাপদ হিসেবে স্বর্ণের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, ডলার দুর্বল হওয়ায় এটিও স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলছে। তৃতীয়ত, অর্থনীতি সুরক্ষায় অনেক দেশ বিপুল অঙ্কের প্রণোদনা দিচ্ছে, সেই সঙ্গে কমাচ্ছে সুদের হার। এর কারণেও স্বর্ণের দাম বাড়ছে। সিএনবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থনীতি রক্ষায় ব্যাপকভাবে প্রণোদনা দিচ্ছে। এর পাশাপাশি সুদের হার নিম্নমুখী রাখছে। এতে এ বছর স্বর্ণের দাম ১৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাবাজার অস্থিরতার সময়ে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করা হয়।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ায় এ প্রভাব ইতোমধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে। অতীতে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সাধারণত ভরিতে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা কম-বেশি করা হতো। অথচ গত সপ্তাহে একলাফে প্রায় ৫ হাজার টাকা দাম বাড়ানো হয়। ১১ দিনের ব্যবধানে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি বাড়ানো হয়েছে ৪ হাজার ৪৩২ টাকা। ২২ ক্যারেটের ভরি প্রতি সর্বোচ্চ দাম পড়বে ৭৭ হাজার ২১৫ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম ধরা হয়েছে ৭৪ হাজার ৬৬ টাকা। একইভাবে ১৮ ক্যারেটের ভরির দাম পড়বে ৬৫ হাজার ৩১৮ টাকা। সনাতন পদ্ধতিতে স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম ধরা হয়েছে ৫৪ হাজার ৯৯৫ টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) সাধারণ সম্পাদক দিলিপ কুমার আগারওয়ালা বলেন, বাংলাদেশের বাজারে এর আগে কখনই এত বেশি দামে স্বর্ণ বিক্রি হয়নি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দর অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও তাদের দাম বাড়াতে হয়েছে। তিনি আরো বলেন, করোনার কারণে এখন অর্থনৈতিক যে পরিস্থিতি তাতে আমাদের ক্রেতা কমে গেছে ৮২ থেকে ৮৩ শতাংশ। আগামী দিনগুলোতে এটি ১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও দাম বেশি থাকলে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ক্রেতা কমে আসবে। তবে আমদানি পুরোদমে শুরু হলে এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো চলা শুরু করলে স্বর্ণের সরবরাহ বাড়বে। তখন দাম কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সভাপতি এনামুল হক খান বলেন, আপাতত স্বর্ণের দাম কমার সম্ভাবনা নেই। তবে যতটুকু ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে তা আমদানি উৎসাহিত করতে যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন। কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, নিম্নবিত্তরা তো আগে থেকেই স্বর্ণ কেনা বাদ দিয়েছেন। এখন মধ্যবিত্ত পরিবারেও নাগালের বাইরে চলে গেল এ ধাতব মুদ্রা।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে স্বর্ণ আমদানির ওপর শুল্ক ছাড় দেয়া হয় ভরিতে ১ হাজার টাকা। এ ছাড়া বছরে ৩ বার ব্যাগেজ রুলের আওতায় ২৩৪ গ্রাম বা ২০ ভরি পর্যন্ত স্বর্ণ আনার সুযোগও দেয়া হয়। এ জন্য প্রতি ভরির জন্য ২ হাজার টাকা কর দিতে হবে। আগে স্বর্ণবার আমদানিতে ৩ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হতো। এখন ২০ ভরি স্বর্ণের বার আনতে ৪০ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে যোগ করা হয় আরো একটি বড় সুবিধা। চলতি অর্থবছরের শুল্ক সুবিধার সঙ্গে আগামী অর্থবছরের জন্য স্বর্ণের আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পুরোটাই প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। দেশে আমদানিকে উৎসাহিত করতেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে বাজেট বক্তব্যে বলা হয়েছে। এতে ভরিতে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আমদানি খরচ কমবে বলেও মনে করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। এত সুবিধার পরও স্বর্ণের আমদানিতে আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের। অথচ দেশে প্রতিবছর ২০ থেকে ৪০ টন স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে স্বর্ণ আমদানি নীতিমালা চূড়ান্ত করে সরকার। সে মোতাবেক দেশে ১৮ প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পেলেও গত ৬ মাসে মাত্র ১টি কোম্পানি স্বর্ণ আমদানিতে এলসি খুলেছে। সম্প্রতি বৈধপথে স্বর্ণ ১১ কেজি আমদানি করা হয়েছে। ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের কর্ণধার দিলিপ কুমার আগরওয়ালা বলেন, স্বর্ণ আমদানির সুযোগ দেয়া হলেও ভ্যাট বেশি হওয়ার কারণে আমদানি করতে আগ্রহ দেখায়নি অনেক ব্যবসায়ী। তবে এবারের বাজেটে ভ্যাট কমানোয় অনেকেই আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান তিনি। এটাই ৪৯ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে বৈধপথে প্রথম স্বর্ণ আমদানি। এর মধ্য দিয়ে দেশের জুয়েলারি শিল্পের ইতিহাসে একটি সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হলো। পিআর

LEAVE A REPLY