ভোগান্তির ঈদযাত্রা

ঈদুল আজহায় ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগের আর শেষ নেই। রেল সড়ক ও নৌ তিন পথেই যাত্রীদের ভোগান্তির ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। রেলের শিডিউল লণ্ডভণ্ড সড়ক পথেও অবস্থা প্রায় একই রকম। পথে পথে দীর্ঘ যানজট। ফেরিতে বিলম্ব। ঢাকা থেকে বাস ছাড়ার সময়সূচি ভেঙে পড়েছে। নৌপথে শৃঙ্খলার বালাই নেই। বিআইডব্লিউটিএ ও র‌্যাব-পুলিশের বাধা কাজে আসেনি। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ঝুঁকি নিয়ে ছাড়ছে লঞ্চ।

ট্রেনের শিডিউল লণ্ডভণ্ড

রেলওয়ে : ট্রেনের শিডিউল বলতে কিছু নেই। যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হচ্ছে কমলাপুর স্টেশনেই। সকাল ৬টার ট্রেন কখন ছাড়বে তা স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানাতে পারছে না। ‘এলে-যাবে’ এমন পদ্ধতিতে চলছে ট্রেনগুলো। আবার বেশ কিছু ট্রেন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা দেরিতেও ছাড়তে পারে বলে রেল সূত্র জানিয়েছে। গত শুক্রবারের রাজশাহীগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ঢাকা ছাড়ার কথা ছিল রাত সাড়ে ১১টায়। কিন্তু ছেড়েছে গতকাল শনিবার সকাল ১০টায়। এই ট্রেনের যাত্রী কান্তা ইসলাম বলেন, সারারাত স্টেশনে ছিলাম, অনেক কষ্ট। তারপরও বাড়ি যেতে পারছি এটাই আনন্দের।
এদিকে গতকাল সরজমিনে কমলাপুরে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশন চত্বরে উৎকণ্ঠা নিয়ে হাজারো মানুষ শুয়ে বসে সময় কাটাচ্ছেন। কখন ট্রেন আসবে তা জানার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো সদুত্তর মেলেনি। স্টেশন ম্যানেজারের চেয়ার ফাঁকা। তথ্য দেয়ার মতো কেউ নেই। মাইকে মাঝে মাঝে কোন ট্রেন কখন ছেড়ে যাচ্ছে তা বলা হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত বিলম্ব হওয়া ট্রেনগুলো সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য দেয়া নেই বলে অভিযোগ করেন যাত্রীরা। খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রী রাখী বলেন, ভোর ৬টায় স্টেশনে এসে বসে আছি। ঘুমন্ত দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে কি যে কষ্ট বিড়ম্বনা তা বলে বোঝানো যাবে না। এখন বলা হচ্ছে ট্রেনটি ১২টার পর ছাড়বে। দেখা যাক এত ভিড়ে ট্রেনে উঠতে পারি কিনা।
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা জানান, সময়মতো স্টেশনে এসে দীর্ঘ অপেক্ষায় তারা ক্লান্ত। বিশেষ করে বাচ্চা, বয়ষ্ক ও মেয়েরা পড়েন চরম সমস্যায়। শত শত মানুষ স্টেশনে চত্বরে রাত কাটাতে বাধ্য হন। এদিকে এক একটি ট্রেন আসছে তো শত শত মানুষ হুমড়ি খেয়ে তারা গেটে ভিড় করছে। ঠেলাঠেলিতে হট্টগোল। কোনো মতে কেউ কেউ উঠতে পারলেও নারী, শিশু ও বয়ষ্করা উঠতে না পেরে অনেককে জানালা দিয়ে ঠেলে ওঠাতে দেখা যায়। বৈধ টিকেটধারী হয়েও সিট না পেয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হতে দেখা গেছে কাউকে কাউকে। আবার ভেতরে উঠতে না পেরে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে আসীন হতে দেখা গেছে সব বয়সী মানুষকেই। সেখানেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও সক্রিয় হতে দেখা যায়নি।
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, গত শুক্রবার বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাড়ে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। পরবর্তীতে যমুনা সেতুর পূর্বে রেলের ফিসপ্লেট সরে যায়। যার ফলে সাড়ে তিন ঘণ্টাধিককাল রেল চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। সেকারণে গতকাল শনিবার বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে যাতায়াতকারী সব ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। তাই অধিকাংশ ট্রেনই স্টেশনে এসে পৌঁছলে তবেই ছেড়ে যাবে অবস্থায় চলছে। অনিচ্ছাকৃত এ বিলম্বের জন্য যাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে রেলকর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনে টিকেট ফেরত দিয়ে অর্থ ফেরত নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন রেল সচিব। টিকেট ফেরত নেয়ার জন্য ৫ নম্বর কাউন্টারে যোগাযোগ করার কথা মাইকে ঘোষণা করা হয়।
গতকাল সরেজমিন কমলাপুরে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৬টা ২০ মিনিটে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটি বেলা ২টা নাগাদ স্টেশন ত্যাগ করে। সকাল ছয়টার ধূমকেতু এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় সন্ধ্যে ৭টায়। এদিকে পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী ছয়টি ট্রেনের যাত্রার সময় পরিবর্তন করে পুনর্নিধারণ করে রেল কর্তৃপক্ষ। এ ট্রেনগুলো শনিবার কমলাপুর থেকে ছাড়তে ১ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হতে পারে বলে জানানো হয়। রেলের জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
রেলসূত্র অনুযায়ী, গতকাল ৭৬৯ নং ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেন সাড়ে ১২ ঘণ্টা বিলম্বে বিকেল সাড়ে ৬টায়, ৭৬৫ নং নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন ১১ ঘণ্টা ১০ মিনিট দেরিতে সন্ধ্যা সোয়া ৭টায়, ৭৭১ নং রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন ছাড়ার পরিবর্তিত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে। এ ট্রেনের যাত্রীদের স্টেশনে অপেক্ষা করতে হবে ১৩ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের বেশি। আর লালমনিরহাট ঈদ স্পেশাল ট্রেনটি ১৫ ঘণ্টা বিলম্বে রাত সোয়া ১১টায়, ৭৫৩ নং সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ৯ ঘণ্টা দেরিতে দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের পরিবর্তে ঢাকা ছাড়বে আনুমানিক ১২টা নাগাদ।
বাংলাদেশ রেলওয়ে কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার আমিনুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, গত শুক্রবার টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্তে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়া ও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপই ট্রেন বিলম্বিত হওয়ার কারণ। ৫৬টি ট্রেন ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা। এর মধ্যে ৩৫টি আন্তঃনগর। আরো ৪টি আছে স্পেশাল ট্রেন। সব কটি ট্রেনই দেরি করে ছাড়বে। আসলে ট্রেন আসতে দেরি করছে তাই ছাড়তেও সঙ্গত কারণে বিলম্ব তো হবেই। কিছু করার নেই। ঈদের আগে শিডিউল বিপর্যয় কাটানো সম্ভব নয়।

যানজটে স্থবির ঢাকা-টাঙ্গাইল ও বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক

সড়কযাত্রা : রাত ফুরোলেই ঈদ। তাই পথের কষ্ট নিয়ে ঘরে ফিরছে মানুষ। বাসের অপেক্ষায় টার্মিনালে নিঘুর্ম রাত কাটানোর পর সড়ক পথেও ঘরমুখো মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বাসের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। গতকাল দুপুরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুরকি বাজার থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত সড়কে ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটে যাত্রীরা নাকাল হলেও বিকালে তা ৪০ কিলোমিটারে পৌঁছায়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা শিমুলিয়া ও পাটুরিয়ায় ফেরিঘাটে দীর্ঘ যানজটের কবলে পড়েন। একদিকে যানবাহনের চাপ এবং পশুবাহী ট্রাকের চাপের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়েছে বলে পরিবহন কোম্পানির কর্মচারীরা জানিয়েছেন।
এদিকে মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে এসে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মহাসড়কে যানবাহনের ধীর গতির কারণে সমস্যা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ ঈদযাত্রার দুর্ভোগকে কখনোই দুর্ভোগ বলে মনে করে না। তারা দুর্ভোগকে ঈদ আনন্দের অংশ হিসেবে মনে করে। তবে, সড়কে কিছুটা দুর্ভোগ যে নেই, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এদিকে, শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে গাবতলী বাস টার্মিনালে গত শুক্রবার সকাল থেকেই যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই ধারা গতকালও অব্যাহত ছিল। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসের শিডিউল বিপর্যয় ও যাত্রীর চাপ বাড়তেই থাকে। প্রতিটি কাউন্টারের সামনে হাজার হাজার যাত্রীকে রাত কাটাতে হয়েছে। মহিলার ও শিশুদের দুর্ভোগ অবর্ণনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিটি কাউন্টারের সামনেই যাত্রীদের উপছে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। যাত্রীর ভিড়ের কারণে টার্মিনালে ঢোকা দায়। নাবিল পরিবহনের সুপারভাইজার শামীম জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রীবাহী বাসের পাশাপাশি পশুবাহী ট্রাক চলাচল করায় সকালের দিকে উত্তরার আবদুল্লাহপুর থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কের জামুরকি, নাটিয়াপাড়া এলাকার ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। এখানে যানবাহন চলে ধীর গতিতে। কিন্তু যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সিরাজগঞ্জ পৌঁছতে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে গেছে।
গতকাল সকালে মাজার রোডের এসএস ফিলিং স্টেশনের ভেতরে দুধের শিশুসহ ২ শতাধিক বিভিন্ন বয়সী যাত্রীকে অপেক্ষার প্রহর গুনতে দেখা যায়। যাত্রী শরিফুল আলম জানান, তারা রংপুর যাওয়ার জন্য নাবিল পরিবহনের শুক্রবার রাতের বাসের টিকেট কেটেছিলেন। কিন্তু বাস না আসায় সারারাত তাদের কাউন্টারের সামনেই কাটাতে হয়েছে। সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় সকালে ওই ফিলিং স্টেশনের সামনে বসিয়ে দেয়া হয়। বাস এলে ডেকে নেয়া হবে।
এদিকে গতকালও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করে। টাঙ্গাইল পার হতেই পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লেগে যায় বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেন। মির্জাপুরের জামুরকি বাজার থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত সড়কে ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের ফলে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া পাকুল্লা, করটিয়া বাইপাস, রাবনা বাইপাস এলাকাতেও থেমে থেকে যানজটের সৃষ্টি হয়। সেতু পার হয়ে সিরাজগঞ্জ দিয়ে দ্রুত যেতে না পারার কারণে যানজট এলেঙ্গা পর্যন্ত ঠেকেছে। মহাসড়কের দায়িত্বরত পুলিশের এসআই মাজাহারুল ইসলাম জানান, শুক্রবার রাত থেকেই এই সড়কে থেমে থেমে গাড়ি চলেছে। যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে সেতুর উভয় পাড়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সিরাজগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের সদস্য রশিদুল ইসলাম জানান, সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত নলকা সেতু পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এবং এরিস্ট্রোক্রেট মোড়ে ইছামতি সেতুর কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। তবে একেবারে থেমে নেই।
শ্যামলী পরিবহনের কর্মচারী সুভাষ জানান, এবার সড়ক পথে দক্ষিণাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের যাত্রীরাই বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। শুক্রবার ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে বাস ছেড়েছে। গতকাল তা ৬/৭ ঘণ্টায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবির জানান, গত শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শনিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে ৩৬ হাজার ৩৩৭টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী গাড়ির সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৩০৮টি এবং উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী গাড়ি ছিল ১২ হাজার ১৩৯টি। টোল আদায় হয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ ৪৩ হাজার ১৪০ টাকা।
এদিকে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে পাটুরিয়া ও শিমুলিয়া ফেরিঘাটে প্রশাসনের নেয়া সব উদ্যোগ ভেস্তে হয়ে গেছে। এই দুই ফেরিঘাটে গতকাল যাত্রীদের ঢল নামে। বিকালের দিকেও এখানে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট ছিল। হাজার হাজার যাত্রী দুর্ভোগ এড়াতে বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে ফেরিঘাটের দিকে রওয়ানা হন। তারা ফেরি ও লঞ্চে পদ্মাপাড় হয়ে কাঁঠালবাড়ি ও দৌলতদিয়া যাওয়ার উদ্যোগ নেন। ফলে ফেরিঘাটে যাত্রীর ঢল নামে। এর পাশাপাশি উভয় ঘাটেই শত শত যানবাহনকে ফেরি পারাপারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে।

ছাদে-ডেকে যাত্রী বোঝাই করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে লঞ্চ

নৌপথ : দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের চাপে গতকাল শনিবার সব শৃঙ্খলাই যেন ভেঙে পড়ে দেশের প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটের। পন্টুনে লঞ্চ আসামাত্রই তাতে হুড়োহুড়ি করে উঠতে শুরু করেন যাত্রীরা। মুহূর্তেই ভরে যায় লঞ্চগুলো। অতিরিক্ত যাত্রী ওঠা ঠেকাতে এ সময় বিআইডব্লিউটিএ, র‌্যাব-পুলিশের কোনো বাধাই কাজে আসেনি। ছাদে-ডেকে যাত্রী বোঝাই করে গতকাল সদরঘাট টার্মিনাল ছাড়তে দেখা গেছে প্রতিটি লঞ্চকে।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক আলমগীর কবির জানান, এবার ঈদযাত্রায় গতকাল শনিবার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে। আড়াই-তিন লাখ যাত্রী সন্ধ্যা পর্যন্ত সদরঘাটে আসেন। আগের দিন শুক্রবার ১৩০টি লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের ৪৩টি গন্তব্যে ছেড়ে গিয়েছিল। আর গতকাল এ সংখ্যা ১৫০টি হতে পারে বলে তাদের ধারণা। তিনি জানান, লঞ্চের চালক ও শ্রমিকরা এ সুযোগে কোনো নিয়মকানুন মানতে চাইছেন না। আমরা যাত্রী পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লঞ্চটিকে ঘাট ছাড়তে নির্দেশ দেই। কিন্তু তারা ছেড়ে যেতে ইচ্ছাকৃতভাবে গড়িমসি করে। এ সময়ের মধ্যে অনেক যাত্রী বিপজ্জনকভাবে লঞ্চে উঠে যায়, যাদের আর নামানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া ঘাটে ভেড়ানোর জন্যও লঞ্চগুলো প্রতিযোগিতা করে বলে জানান তিনি।
সকাল থেকেই বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, বরগুনা, পিরোজপুরসহ বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা সদরঘাটে পৌঁছতে শুরু করেন। দুপুরের পর যাত্রীদের চাপে বেসামাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে বারবার পন্টুনে ঢোকার গেট বন্ধ করে যাত্রীদের স্রোত নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় সংশ্লিষ্টদের। নতুন টার্মিনাল ভবনের দোতলায়ও অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ব্যাপক ভিড় ছিল। লঞ্চগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করতে বিআইডব্লিউটিএ বারবার মাইকিং করলেও সেগুলো খুব কার্যকর হতে দেখা যায়নি।
এদিকে নির্ধারিত সময়ে লঞ্চ ঘাটে না আসা ও না ছাড়ার বিষয়টি জানিয়েছেন অনেক যাত্রী। এমভি ফারহান লঞ্চের কেবিন যাত্রী সুকুমার বণিক বলেন, লঞ্চটি ঘাটে আসার কথা ছিল দুপুর ১টায়। কিন্তু সেটি প্রায় দেড়ঘণ্টা পরে টার্মিনালে আসে। আরেক যাত্রী জানান, পারাবত-৩ নামের লঞ্চটি বিকাল ৩টায় ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ৫টার পর ছাড়ে।
সদরঘাটে প্রবেশের আগে দীর্ঘ যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। রহমত আলি নামে একজন জানান, বাহদুর শাহ পার্কের সামনে এক অরাজক অবস্থা। বাস, টেম্পো, রিকশা, সিএনজি সব জট পাকিয়ে আছে। সেখানে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই। ফলে অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে এসে লঞ্চে উঠতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে গতকাল বিকালে সদরঘাটে আসেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি এ সময় যাত্রীদের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে সুষ্ঠু ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সবাইকে নির্দেশ দেন। ঝুঁকিপূর্ণভাবে যেন কোনো লঞ্চ ছাড়তে না পারে সে জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতকে কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে ওই লঞ্চের যাত্রা বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সচেতন হওয়ারও আহ্বান জানান। বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুব-উল-ইসলাম এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন।

source: ভোরের কাগজ

LEAVE A REPLY