কুরবানির চামড়ায় আগ্রহ নেই ট্যানারি মালিকদের

সাভার ট্যানারি শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে বাংলাদেশি চামড়ার চাহিদা কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে। প্লটের কাগজ বুঝে না পাওয়ায় ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন না অনেক শিল্প মালিক। একই সঙ্গে গত বছর সংগৃহীত চামড়ার ৫০ শতাংশ এখনো অব্যবহৃত থাকায় এ বছর নতুন চামড়া কেনার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। ফলে আসন্ন কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনে চামড়ার বাজার পড়ে গেছে। এ ছাড়া সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর মালিকরা ঋণ পেতে নানামুখী সমস্যা মুখোমুখি হচ্ছেন। যেমন- সাভার চামড়া নগরীতে যেসব শিল্প মালিক প্লট পেয়েছেন অথচ মালিকানা বুঝে পাননি, তাদের ব্যাংক ঋণ পেতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে আসন্ন কুরবানির ঈদে চামড়া সংগ্রহে ব্যবসায়ীরা অর্থের সংকটের আশঙ্কা করছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল ১৩৮ কোটি ডলার। তা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। ওই অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এ আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। এর আগের বছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতে আয় হয়েছিল ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন চামড়া শিল্প নগরী ঘুরে দেখা গেছে, এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। ফায়ার স্টেশন নির্মাণ হয়নি। কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে উন্মুক্ত স্থানে। যার কারণে আশপাশের পরিবেশ প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। শিল্প নগরীর আশপাশের বাসিন্দারা জানান, দিন দিন এই স্থান বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সিইটিপি পূর্ণাঙ্গ কাজ না করায় দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী। অনেক সময় ওভার ফ্লোর কারণে পরিশোধন ছাড়ায় বর্জ্য মিশছে নদীর পানিতে।
একটি আধুনিক ট্যানারি পল্লী স্থাপনের উদ্দেশ্যে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করা হয় এ শিল্পকে। সেখানে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের শর্ত রয়েছে। তবে বিভিন্ন ট্যানারি এবং কঠিন বর্জ্য ডাম্পিংয়ের স্থানে সাধারণ গ্লাভস পরে শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেছে। নিয়মিত দুর্ঘটনাও ঘটছে। আর এসব কারণেই বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, আসলেই চামড়া খাতের অবস্থা ভালো নয়। সর্বত্র চামড়াজাত পণ্যের অর্ডার কমে গেছে। চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার হিসেবে পরিচিত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে গেছে।
নতুন করে চামড়া কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাদের হাতে নেই জানিয়ে তিনি বলেন, চামড়া কেনার জন্য গত বছর ব্যাংক থেকে যে ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছিল, সেই টাকা তাদের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক যে প্রক্রিয়ায় ঋণ দেয় তা সহজ নয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অব্যবহৃত চামড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহীন আহমেদ বলেন, গত বছর কিনেছি অথচ ব্যবহার করতে পারিনি, এমন চামড়ার পরিমাণ ৫০ শতাংশ। তাই এ বছর আমাদের চামড়ার চাহিদা তেমন নেই। অর্ডারও কম। কমপ্লায়েন্সের বিষয়েও ক্রেতারা অসন্তুষ্ট। তাই এ বছর যদি কাঁচা চামড়া রপ্তানি হয় সে ক্ষেত্রেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তিনি আরো বলেন, চামড়া খাতের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ সাভারের ট্যানারি পল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারকে পুরোপুরি কার্যকর করতে না পারা। একদিকে সরকারের টাকাও নষ্ট হলো, অন্যদিকে পল্লীর পাশে ধলেশ্বরী নদীও দূষিত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল হালিম ভোরের কাগজকে বলেন, সিইটিপির ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এর নির্মাণ সম্পূর্ণ হবে। এ ছাড়া শিল্প নগরীর সীমানা প্রাচীর বাদে অন্যসব কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। জমির কাগজপত্র বুঝে না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে সব ট্যানারি মালিক নিয়ম মেনে টাকা জমা দিয়েছেন তারা কাগজপত্র বুঝে পেয়েছেন।
প্রসঙ্গত, প্রতি বছর কুরবানির সময় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে মোট ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পিস চামড়া পাওয়া যায়। যা সারা বছরের সরবরাহের প্রায় ৯০ শতাংশ। তাই চামড়া শিল্পের ব্যবসায়ীরা কুরবানির সময় তাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করেন।

source: ভোরের কাগজ

LEAVE A REPLY