আধুনিকতার কাছে ঐতিহ্যের পরাজয়

ভারতে নির্বাচনের ফলাফল অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও এটি তেমন অপ্রত্যাশিত ছিল না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার কংগ্রেসের চেয়ে সুস্পষ্টভাবে মানুষের সামনে তাদের কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলো তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে। অন্যদিকে একে আক্রমণ করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে যায় মোদিকেই ‘চোর’ সাব্যস্ত করার বিষয়টি। এটি শাপে বর হয়ে দাঁড়ায় মোদি পক্ষের জন্যই। এ ছাড়া অন্যান্য যে বিষয়ালোর দিকে মনোযোগ দিলে বিজেপির বিজয় ‘অপ্রত্যাশিত বা বিস্ময়কর’ মনে হবে না, সেগুলোর মধ্যে প্রথমেই বলতে হয়, বিজেপি এবং কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেকার মৌলিক কৌশলগত পার্থক্যের বিষয়টি। বিজেপির সামগ্রিক প্রচারণায় এ নির্বাচনটি ছিল অনেকটা দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো। অন্যদিকে কংগ্রেস ও তার সমমনারা একে দেখেছে ৫৪৩টি পৃথক আসনে পৃথক প্রার্থীর পৃথক নির্বাচন হিসেবে।ফলে সহজেই হেরে গেছে তারা। অথচ বিজেপি মাত্র একজন প্রার্থীকে সামনে রেখে সাফল্যের সঙ্গে লোকসভা নির্বাচনটিকে একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রূপ দেয় এবং লুফে নেয় জয়।

এরপর, বিজেপির পাতা এ ফাঁদে ভালোভাবেই ধরা দেয় কংগ্রেস। তারা মোদিকেই তাদের সমস্ত আক্রমণের লক্ষ্যবিন্দু বানিয়ে ফেলে। কিন্তু প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তার ওপর নির্ভর আক্রমণের কৌশল নির্ধারণ করলে জিতে আসা কঠিন। মানুষকে দেয়ার মতো কোনো বার্তা নিজের ঝুলিতে না থাকলে তখন আরো কঠিন হয়ে পড়ে বিষয়টি। চৌকিদার (মোদি) চোর হ্যায়, এবং রাফায়েল দুর্নীতির স্লোগান সামনে এনে কংগ্রেস যে অনুভ‚তি তৈরি করতে চেয়েছে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে, তাতে পার্টিজান কংগ্রেসকর্মী ছাড়া আম ভোটারের সাড়াও পাওয়া যায়নি তেমন একটা। ভোটারদের মন গলাতে চাই একটি ইতিবাচক আহবান। কংগ্রেসের রাহুলের ক্ষেত্রে সেটি ছিল ‘ন্যায়’। কিন্তু স্লোগানটি যতদিনে তারা মাঠে আনে, ততদিনে পেরিয়ে গেছে মূল্যবান অনেকটা সময়। তাছাড়া ‘ন্যায়’ বিষয়টির উপস্থাপনাও ছিল বেশ জটিল প্রকৃতির। একজন বিশ্লেষক জানান, নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে ১০ দিনে ভারত চষে বেড়াবার সময়ে আমি কোথাও এমন কাউকে পাইনি যিনি ন্যায়ের এ বিষয়টি জানেন, কিংবা শুনেছেন। কিংবা তার বাস্তবায়ন হলে তার কী উপকার পাওয়া যাবে সে বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারেননি। রণকৌশল নিতান্ত আনাড়ি, পরিকল্পনা ভয়ানক অস্বচ্ছ থাকলেই সাধারণত এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। দরিদ্র ভারতীয় ভোটারদের মন ফেরানোর জন্য কোনো কাজেই আসেনি বিদেশ থেকে আমদানি করা এই ধারণা। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় অর্ধেক ভোটার আসলেই ন্যায়-এর কথা শুনেছেন, তবে শেষমেষ দেখা গেছে যারা শুনেছেন তারা সবাই মূলত উচ্চবিত্ত শ্রেণির অংশ। অর্থাৎ, ন্যায় বাস্তবায়ন হলে যাদের কাজে আসবে তাদের বিষয়টি জানা নেই। আর সেটি জানা ছিল কেবল তাদেরই যাদের দেয়া অর্থে এই ন্যায় বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। ফলে এর পরিণতি কী হতে পারে তার ধারণা পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। এরপর আছে অমিত শাহ ও মোদির ব্যক্তিগত উপলব্ধির দক্ষতা। রণাঙ্গণে নিজের মিত্র বেছে নিতে ও নতুন মিত্র তৈরির মিশনে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন অমিত শাহ এবং নরেন্দ্র মোদি। নিজেদের হৃদয়ের উদারতার বিষয়টি তুলে ধরতে সক্ষম হন তারা। বিহারে নিতিশ কুমারকে ছাড় দেয়া এর এক উৎকৃষ্ট নমুনা। বিপরীতক্রমে উত্তর প্রদেশ, দিল্লি এবং হরিয়ানার গোঁয়ার্তুমির চরম নমুনা স্থাপন করে কংগ্রেস। বিজেপি তার মিত্র বাছাই করে দূরপ্রসারী লাভের কথা মাথায় রেখে, আর অতীতে গৌরবের অন্ধ অহঙ্কারে নিজেকে আটকে রাখে কংগ্রেস।
এর পর যেটি বলতে হচ্ছে, কেরালা এবং পাঞ্জাবের ব্যতিক্রম ছাড়া অন্য সবখানে বিজেপির অগ্রযাত্রা রুখে দেয় আঞ্চলিক দলগুলো। এর একটি তামিলনাড়–। কেরালায় বিজেপির যাত্রা সবে শুরু, যদিও সেখানে বামদের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে নতুন পথ তৈরি হচ্ছে বিজেপির জন্য। পাঞ্জাবের বিষয়টি লক্ষ্য করা যেতে পারে। বিজেপির কৌশল ছিল, সেই সব এলাকায় নজর রাখা যেখানে কংগ্রেস তাদের প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী। অন্যত্র মূল কাজ, আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে সমঝোতায় পৌঁছানো। অন্ধ্র প্রদেশে ওয়াইএসআরসিপি এবং তেলেঙ্গানার কেসিআরের দিকে তাকালে পরিষ্কার হতে পারে বিষয়টি। এরপর আছে গণমাধ্যমের বিষয়টি। রাজনৈতিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সময়মতো নিজের মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করে নেয় বিজেপি। পক্ষান্তরে কংগ্রেস কী করেছে এর পাল্টা হিসেবে? ভোটাভুটির শেষ পর্যায়ে এসেই কেবল গণমাধ্যমে কিছুটা দৃশ্যমান হতে দেখা যায় রাহুলকে। গোটা সময়টা কংগ্রেস নিজেকে মূলত সীমাবদ্ধ রাখে টুইটার-চর্চা ও তার প্রতিক্রিয়া-পাল্টা প্রতিক্রিয়া আর সমর্থকদের হাততালির মধ্যেই। এছাড়াও বলতে হবে মোদির সরকারের কথা। সমালোচকরা যে যাই বলুক, বাস্তবিক ভারতে গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিগত পাঁচ বছরে অসাধারণ সাফল্য প্রদর্শন করেছে তার সরকার। পাঁচ বছরে ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশ এবং রাজস্থানে কংগ্রেসের জয়ের চেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল ২০১৭ সালে গুজরাটে মোদিকে কিছুটা কোনঠাসা করতে পারা। ওই ঘটনায় দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়; এক, গ্রামীণ কৃষকের দুরবস্থার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে বিজেপির ভোটব্যাংক এবং যেহেতু মোদির হাতে কোনো ত্বরিত সমাধানের সুযোগ নেই, সে কারণে তাকে প্রচারণায় আসতে হয় জাতীয়বাদ ও হিন্দুত্ববাদের জোয়ার তুলে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। এরপর আছে রাহুলের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি। দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত অবধি সবার কাছেই ‘চমৎকার এক মানুষ’ রাহুল গান্ধী কিন্তু একইসঙ্গে, তিনি তো রাজনীতিতে ‘অপরিপক্ব’। কেন তিনি কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেননি যে দশ বছর ক্ষমতায় ছিল তার দল, প্রশ্ন অনেকের। আরো নির্মম প্রশ্ন করেন সাধারণ ভোটাররা, কী কাজ করেন তিনি নিজের লাইফস্টাইল বজায় রাখা কিংবা জীবিকা নির্বাহের জন্য? ভারতের এখনকার প্রজন্ম এক নতুন প্রজন্ম যারা কেবল প্রার্থীর যোগ্যতাকেই যাচাই করতে রাজি, তার পূর্বপুরুষের গৌরবের ইতিহাস কিংবা কীর্তির প্রতি অন্ধ ভক্তিতে নয়। মোদি তাদের চোখে এমন এক মানুষ নিজেকে যিনি গড়ে তুলেছেন নিজের হাতে, রাহুলের মতো বংশগৌরবের তোয়াক্কা না করেই। এমনও প্রশ্ন উঠেছে, কী করেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। প্রচারণায় তার আবির্ভাবের বিষয়টি লোকেরা কৌশলগত সম্পদ হিসেবে নয়, দেখেছে একজন অতিথি শিল্পী হিসেবে। উত্তর প্রদেশে তাকে আটকে রাখাটা আত্মঘাতী ফল দিয়েছে কংগ্রেসের জন্য। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক কিংবা মহারাষ্ট্রে আরো কার্যকর ভ‚মিকা রাখার সুযোগ ছিল তার। কংগ্রেসের সবচেয়ে ফলদায়ী মুখ হতে পারতেন তিনি যদিও তার সমুদয় অপচয় করা হয় প্রিয়াঙ্কাকে কেবল উত্তর প্রদেশে আটকে রেখেই।

source: ভোরের কাগজ

LEAVE A REPLY