উচ্চ সুদের ঋণে আবাসনে স্থবিরতা

একদিকে লাগামহীন ব্যাংক ঋণে উচ্চসুদের হার, অন্যদিকে নির্মাণ সামগ্রীর দামও আকাশছোঁয়া। ফলে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে গৃহনির্মাণ করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা।
দেখা গেছে, প্রতি বছরই নির্মাণশিল্পের বিভিন্ন পণ্যের মূল্য কিছু কিছু করে বাড়ছে। ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণের সুদে কোনো কমতি তো নেই বরং বাড়ছে। আবাসন খাত মন্দা হলেও এ খাতে ব্যাংক ঋণ সুদের উচ্চ ব্যবসা চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নানা সার্ভিস চার্জ। ফলে আবাসন খাতে হোম লোনের বিপরীতে উচ্চ সুদের কারণে অনেকে ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। দেশের ব্যাংকিং খাতে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসুবিধা না থাকায় নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার আশা পূরণ হয় না অনেকের। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাট কেনা, ভবন নির্মাণে ঋণের ব্যবস্থা রাখলেও উচ্চ সুদহারের কারণে তা নেয়ার সাহস পান না সীমিত আয়ের ক্রেতারা।
এদিকে সরকার তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে যে গৃহঋণ চালু করেছে, তার ইতিবাচক প্রভাব এ খাতে পড়তে শুরু করেছে। আপাতত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে এই ঋণ নেয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় আট হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ঋণের জন্য আবেদন করেছেন। এছাড়া হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। আবাসন খাতে এটাই এখন সবচেয়ে কম সুদের ঋণ। হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন গ্রাহকদের সব জায়গায় বাড়ি নির্মাণে ও ফ্ল্যাট কেনায় ৯ শতাংশ সুদহারে ঋণ দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হোম লোনের বিপরীতে এখনো ডাবল ডিজিটের ঋণ বিদ্যমান। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সুকৌশলে সুদের হার কম বলে জানাচ্ছে গ্রাহকদের। কিন্তু প্রসেসিং চার্জ, সার্ভিস চার্জ ছাড়াও অন্যান্য শর্তাবলী খোলাখুলি জানাচ্ছে না। ৪২ হাজার টাকা মাসিক বেতনে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রবিউল ইসলাম। থাকেন মতিঝিল এলাকায়। আয়ের প্রায় সিংহভাগই তাকে ব্যয় করতে হয় বাসাভাড়া বাবদ। সম্প্রতি তিনি একটি ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিভিন্ন আবাসন কোম্পানিতে ঘুরে তার নিজস্ব একটি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন ধূসর হয়ে আসে। রবিউলের পরিকল্পনা ছিল, ব্যাংক ঋণ পেলে তিনি ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন। পরবর্তী সময় বাসা ভাড়ার পরবর্তে ব্যাংক লোন পরিশোধ করবেন। কিন্তু কয়েক মাস এ ব্যাংক ও ব্যাংক ঘুরে তাকে নিরাশ হতে হয়। কারণ হিসেবে তিনি জানান, ব্যাংক ঋণের সুদসহ যে কিস্তি আসে তাতে করে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ নিজস্ব একটি ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবে না। আবাসন ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ নাগরিকদের নিজস্ব ফ্ল্যাটের স্বপ্ন থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউসিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট আলমগীর শামসুল আলামিন (কাজল)। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ব্যাংকগুলো উচ্চসুদে গৃহঋণ দিচ্ছে, যা মানুষ অনেকটা বিপদে পড়েই নিচ্ছে। ব্যাংকগুলো তাদের আমানতের সুদহার বেশি- এমন অজুহাতে হোমলোনের সুদহার কমাচ্ছে না। বিষয়গুলো নিয়ে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের সঙ্গে কথা বলেছি। অর্থমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে এবারের বাজেটে এ বিষয়ে এ সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকবে। তিনি বলেন, আমার মতে, ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণের ব্যবস্থা করা উচিত। এতে যদি সরকারের কোনো বন্ড ইস্যু করতে হয়, তবে সে বন্ড ইস্যু করে হলেও এ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পরিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে পোশাক খাতের পরে লিংকেজ শিল্পের দিক থেকে আবাসন খাতের গুরুত্ব সব থেকে বেশি। উৎপাদনশীল খাত হিসেবে এ খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি রয়েছে।
এসব দিক বিবেচনায় আবাসন খাতের যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনে প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি হবে। তবে এ খাতে চাহিদা ও জোগানের যে ভারসাম্য থাকা দরকার এই মুহ‚র্তে সেটি নেই। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে এ খাতে জোগানের পরিমাণ অনেক বেশি।

source: ভোরের কাগজ

LEAVE A REPLY