‘মদ্যপ অবস্থায় মৃত্যু, এফডিসির অপমান’

এফডিসির প্রধান ফটকের ছবি

প্রতি শিফটে মাত্র দুই-তিনজন নিরাপত্তাকর্মী। এই জনবল দিয়ে বিশাল এই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করব! মদ্যপ অবস্থায় প্রোডাকশন ম্যানেজারের মৃত্যু অবশ্যই দুঃখজনক, একই সঙ্গে এফডিসির জন্য তা অপমান। এ ধরনের ঘটনা এফডিসির ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’ বললেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) নিরাপত্তাপ্রধান আমিনুল করিম। এফডিসির অভ্যন্তরে মদ্যপ অবস্থায় ভবন থেকে পড়ে গিয়ে প্রোডাকশন ম্যানেজার আবু সিদ্দিকের (৫০) মারা যাওয়ার ঘটনায় এ মন্তব্য করেছেন তিনি।

গতকাল রোববার রাত নয়টার দিকে এফডিসির ৮ নম্বর ফ্লোরের দ্বিতীয় তলা থেকে পড়ে যান আবু সিদ্দিক। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এ সময় তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে আবু সিদ্দিককে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত সোয়া ১০টার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আবু সিদ্দিক শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার দুলাল ব্যাপারীর সন্তান। তিনি রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন।

আমিনুল করিম জানান, তিনি এখন ছুটিতে আছেন। তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। জানালেন, মদ্যপ অবস্থায় প্রোডাকশন ম্যানেজারের মারা যাওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। বললেন, ‘এফডিসির অভ্যন্তরে অনেকগুলো সংগঠনের অফিস। দিন-রাত এসব অফিসে নানা ধরনের মানুষের আনাগোনা। অনেক প্রযোজক, পরিচালক ও প্রোডাকশন ম্যানেজার আছেন, যাঁরা রাত পর্যন্ত থাকেন। তাঁদের থাকা নিয়ে আমরা তেমন নজরদারি করতে পারি না। আমরা প্রায়ই শুনি, তাঁরা নাকি পরিচালকের সঙ্গে বসে সিনেমার গল্প নিয়ে আলোচনা করেন। এসব বিষয়ে নজরদারি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে এখন থেকে আর কাউকে ছাড় দেওয়া উচিত হবে না।’

আমিনুল করিম আরও বলেন, ‘এটা ঠিক, এফডিসির নিরাপত্তাব্যবস্থা একদমই অপ্রতুল। আমাদের ওপর মহল থেকে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া নাই যে সন্ধ্যা ছয়টা বা রাত নয়টার পর এফডিসিতে কোনো পরিচালক, প্রযোজক বা ব্যবস্থাপক থাকতে পারবে না। আমাদের কাছে নির্দেশনা থাকলে হয়তো কঠোর হতে পারতাম।’

এফডিসিতে প্রোডাকশন ব্যবস্থাপকের মারা যাওয়ার খবর আজ সোমবার দুপুর পর্যন্তও জানেন না প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন। জানার পর তিনি নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী পরিচালককে এ ব্যাপারে জানার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। আমির হোসেন বলেন, ‘আমি এখনো জানি না, তবে কে মারা গেছেন, কীভাবে মারা গেছেন, খবর নিতে বলেছি। তাই এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। তবে মদ্যপ অবস্থায় এফডিসিতে মারা গেছে, এটা কেউ বলছে না। তা ছাড়া এফডিসির মধ্যে কেউ মদ্যপ কিংবা মাদকাসক্ত কি না, তা ধরে ধরে জানা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব?’

এফডিসিতে মাদকের ব্যবসা, দিনদুপুরে মাদক সেবন হয়—এমন অভিযোগ অনেক দিনের। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব হলে এ সমস্যা অন্তত দূর হতো বলে অনেকের অভিমত। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আমির হোসেন বলেন, ‘আমরা তো সিকিউরিটি ব্যবস্থা শক্ত করেছি। আর কীভাবে টাইট দেব? র‍্যাবকে বলা আছে, পুলিশকেও বলা আছে।’

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফডিসির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের পর থেকে এফডিসিতে কোনো শুটিং নাই। রাত নয়টায় লোকজন থাকে কীভাবে? শুধু কি তা-ই, এখানে মদ খেয়ে মাতালও হয়েছেন। এরপর পড়ে গিয়ে মারা গেছেন! দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এফডিসির যদি এই অবস্থা হয়, তা আমাদের সবার জন্য লজ্জা আর অপমানের।’

এদিকে গত বছরের নভেম্বরে ‘এফডিসিতে মাদকের ব্যবসা!’ শিরোনামে প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর এফডিসি কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে নড়েচড়ে বসে। কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীকে বদলি করে। এফডিসির অভ্যন্তরে কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী তখন প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের বদলি করে কী লাভ! যাঁরা জড়িত, তাঁদের শাস্তি না দিয়ে নিরীহ কিছু কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়ার কোনো অর্থই হয় না। তা ছাড়া অনেকগুলো সংগঠনের অফিস থাকার কারণে বহিরাগত লোকজনের আনাগোনা এফডিসিতে বেশি। এসব নিয়ে এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো কথা বলে না!

LEAVE A REPLY